শব্দ
পদার্থবিজ্ঞানে শব্দ হলো একধরনের কম্পন যা গ্যাস, তরল বা কঠিন মাধ্যমের সাহায্যে শব্দ তরঙ্গ হিসাবে সঞ্চালিত হয়।মানব শারীরতত্ত্ব এবং মনোবিজ্ঞানে শব্দ হলো একধরনের তরঙ্গের শ্রবণ এবং মস্তিষ্ক কর্তৃক এগুলো উপলব্ধি করা। যেসকল শব্দের কম্পাঙ্ক ২০ Hz থেকে ২০ kHz কম্পাঙ্ক সীমার মধ্যে অবস্থিত, কেবল সেই শব্দই মানুষের মধ্যে শ্রবণ অনুভূতি প্রকাশ করে। সাধারণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপে ও বায়ু মাধ্যমে এই শব্দের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ১৭ মিটার (৫৬ ফু) থেকে ১.৭ সেন্টিমিটার (০.৬৭ ইঞ্চি)। ২০ k Hz উপরের শব্দ তরঙ্গগুলি আল্ট্রাসাউন্ড বা শ্রবণাতীত শব্দ হিসাবে পরিচিত এবং এগুলো মানুষের কাছে শ্রবণীয় নয়। ২০ Hz নিচে শব্দ তরঙ্গগুলি ইনফ্রাসাউন্ড বা অবশ্রাব্য শব্দ হিসাবে পরিচিত। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণির শ্রবণসীমা বিভিন্ন হয়ে থাকে
তরঙ্গ হচ্ছে - যে পর্যাবৃত্ত আন্দোলন বা আলোড়নের সঞ্চালনের ফলে শক্তি এক স্থান থেকে আরেক স্থানে স্থানান্তরিত হয়। কিছু তরঙ্গ আছে যেগুলি সঞ্চালনের জন্য মাধ্যমের প্রয়োজন। আবার কিছু তরঙ্গ আছে যেগুলি সঞ্চালনের জন্য মাধ্যমের প্রয়োজন হয়না। এমনি দুইটি উদাহরণ হচ্ছে - শব্দ ও সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসা শক্তি। শব্দ চলাচলের জন্য মাধ্যমের প্রয়োজন হলেও সূর্য থেকে যে শক্তি পৃথিবীতে আসে তা মাধ্যম ছাড়াই সঞ্চালিত হতে পারে। কেননা সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসার সময় এই শক্তিকে এক বিশাল মাধ্যমহীন পথ অতিক্রম করে আসতে হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
তরঙ্গ (Sound)
কোন স্থিতিস্থাপক জড় মাধ্যমের বিভিন্ন কণার সমষ্টিগত পর্যায়বৃত্ত কম্পনের ফলে মাধ্যমে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়, তাকে তরঙ্গ বলে। তরঙ্গ দুই প্রকার। যথা: লম্বিক বা অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ এবং আড় বা অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। শব্দ এক ধরনের অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ।
তরঙ্গ বেগ (V) = তরঙ্গ দৈর্ঘ্য (V) কম্পাঙ্ক (f)

চাঁদে বায়ুমন্ডল নেই। তাই যদি চন্দ্রপৃষ্ঠে কোনো প্রচন্ড বিস্ফোরণ ঘটে তা পৃথিবীতে কখনও শোনা যাবে না। ভ্যাকুয়াম বা শূন্যের মধ্য দিয়ে শব্দ সঞ্চালিত হতে পারে না।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
1.11
0.707
0.637
1.414
শব্দ (Sound)
শব্দ শক্তির একটি বিশেষ তরঙ্গ রূপ যা আমাদের কানে শ্রবণের অনুভূতি জাগায়। বস্তুর কম্পনের ফলেই শব্দের উৎপত্তির হয়। কোনো একটি কম্পমান বস্তু বা কণা এক সেকেণ্ডে যতগুলো পূর্ণ কম্পন সম্পন্ন করে, তাকে তার কম্পাঙ্ক বলে। বস্তুর কম্পন হার্টস (Hz) এককে পরিমাপ করা হয়। মানবদেহে স্বরযন্ত্র শব্দ উৎপন্ন করে।

শব্দের যে বৈশিষ্ট্য দ্বারা কোন সুর চড়া ও কোন সুর মোটা তা বোঝা যায়, তাকে শব্দের তীক্ষ্ণতা বলে। শব্দের তীক্ষ্মতা বেল (Bel) বা ডেসিবেল (Decibel) এককে পরিমাপ করা হয়। শব্দের তীক্ষ্মতা ১০৫ ডিবি এর ওপরে মানুষ বধির হতে পারে। শব্দের তীক্ষ্ণতা শব্দ তরঙ্গের বিস্তার (Wave amplitude) উপর নির্ভর করে। একটি শূন্য পাত্রকে আঘাত করলে ভরা পাত্রের চেয়ে বেশি শব্দ হয়, কারণ শূন্য পাত্রে বাতাসে শব্দ তরঙ্গের বিস্তার বেশি হয়।
লোকভর্তি হল ঘরে শূন্যঘরের চেয়ে শব্দ ক্ষীণ হয় কারণ শূন্য ঘরে শব্দের শোষণ কম হয়। বাদ্যযন্ত্রসমূহ ফাঁকা থাকে কারণ ফাঁপা বাক্সের বায়ুতে অনুনাদ সৃষ্টি হয়ে শব্দের প্রাবল্য বৃদ্ধি পায়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
20 Hz থেকে 200 Hz
20 Hz থেকে 2000 Hz
20 Hz থেকে 20000 Hz
20 Hz থেকে 200000 Hz
৭৫ ডিবি
৯০ ডিবি
১০৫ ডিবি
১২০ ডিবি
শব্দকে নিয়ন্ত্রণ করা
ধোয়া নির্গমণ করা
বায়ু দূষণমুক্ত করা
ইঞ্জিনের গরম বাতাস বেরে করা
শব্দের যে বৈশিষ্ট্য দ্বারা কোন সুর চড়া ও কোন সুর মোটা বুঝা যায় তাকে তীক্ষ্ণতা বলে। শব্দের তীক্ষ্ণতা শব্দ সৃষ্টিকারী বস্তুর কম্পাঙ্ক ও দৈর্ঘ্যের উপর নির্ভর করে। দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেলে তীক্ষ্ণতা কমে এবং দৈর্ঘ্য কমলে তীক্ষ্ণতা বৃদ্ধি পায়। 'কাজেই বাঁশের বাঁশির দৈর্ঘ্য কম হলে শব্দের তীক্ষ্ণতা বৃদ্ধি পাবে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
৭৫ ডিবি
৯০ ডিবি
১০৫ ডিবি
১২০ ডিবি
৩৭ ডেসিবেল
৯৫ ডেসিবেল
১০৫ ডেসিবেল
১২৫ ডেসিবেল
শব্দ সঞ্চারণ (Propagation of Sound)
শব্দ বিস্তারের জন্য স্থিতিস্থাপক মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। শব্দের উৎস এবং আমাদের কানের মধ্যবর্তী স্থানে যদি কোনো স্থিতিস্থাপক জড় মাধ্যম না থাকে তাহলে শব্দ আমাদের কানে পৌছাতে পারে না। চাঁদে বায়ুমণ্ডল নেই। তাই যদি চন্দ্রপৃষ্ঠে কোনো প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে তা পৃথিবীতে কখনও শোনা যাবে না। ভ্যাকুয়াম বা শূন্যর মধ্য দিয়ে শব্দ সঞ্চালিত হতে পারে না।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
শব্দের দ্রুতি (Speed of Sound)
শব্দ প্রতি সেকেন্ডে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে শব্দের গতি বা দ্রুতি বলে। বাতাসে শব্দের দ্রুতি সেকেন্ডে ৩৩২ মিটার বা ঘণ্টায়। কঠিন মাধ্যমে (যেমন- ইস্পাত, লোহা প্রভৃতি) শব্দ সবচেয়ে দ্রুত চলে, তরল মাধ্যমে (যেমন- পানি) তার চেয়ে ধীরে চলে। বায়বীয় মাধ্যমে শব্দের দ্রুতি সবচেয়ে কম আর ভ্যাকুয়াম বা শূন্যে শব্দের দ্রুতি শূন্য। বিভিন্ন মাধ্যম শব্দের বেগের ক্রম -
কঠিন > তরল > বায়বীয়
লোহার মধ্য শব্দ বাতাসের চেয়ে ১৫গুণ দ্রুত চলে। পানির মধ্যে শব্দ বাতাসের চেয়ে চারগুণ দ্রুত চলে। তাই কেউ পানিতে ডুব দিয়ে হাততালি দিলে, সেই তালির শব্দ ডুবন্ত অবস্থায় থাকা ব্যক্তি জোরে শুনতে পাবে। অনুরূপভাবে, সমুদ্রের তীরে একটা বিস্ফোরণ ঘটলে এক কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের পানির নিচে অবস্থানকারী ব্যক্তি একই দূরত্বে সমুদ্রে বা ভূমিতে অবস্থানকারী ব্যক্তি অপেক্ষা আগে শুনতে পাবে।
0°C তাপমাত্রায় এবং স্বাভাবিক চাপে-
মাধ্যম | শব্দের দ্রুতি |
| লোহা | ৫২২১ মি./সে |
| ৭৫৭ মাইল/ঘণ্টা | |
| পানি | ১৪৫০ মি./সে |
| শুষ্ক বায়ু | ৩৩২ মি./সে |
শব্দের দ্রুতি নিম্নোক্ত নিয়ামকের উপর নির্ভরশীল। যথা-
ক) তাপমাত্রা: তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে শব্দের বেগ বৃদ্ধি পায়। ১ সে. বা ১ কেলভিন তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বাতাসে শব্দের বেগ প্রায় ০.৬ মি./সে. বৃদ্ধি পায়। শীতকালের চেয়ে গ্রীষ্মকালে বায়ুর উষ্ণতা বেশি থাকে বলে শীতকালের চেয়ে গ্রীষ্মকালে বায়ুতে শব্দের বেগ বেশি হয়।
খ) আর্দ্রতা: বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে গেলে শব্দের বেগ বেড়ে যায়। বায়ুর আর্দ্রতা বেশি থাকে বলে বর্ষাকালে শব্দ দ্রুততর চলে।
বজ্রপাতের সময় আলোর ঝলক দেখার বেশ কিছু সময় পরে মেঘের গর্জন শোনা যায়। গর্জন এবং আলোর ঝলক একই সাথে ঘটে কিন্তু শব্দের চাইতে আলোর গতি অনেক বেশি। মধ্যকার দূরত্ব অতিক্রম করতে আলোর চেয়ে শব্দের বেশি সময় লাগে। ফলে আলোর ঝলক দেখার বেশ কিছু সময় পরে মেঘের গর্জন শোনা যায়। যে বিমান শব্দের চেয়ে বেশি দ্রুতগতিতে চলে, তাকে বলা হয় সুপারসনিক বিমান। যেমন: কনকর্ড একটি যাত্রীবাহী সুপারসনিক বিমান।

চিত্র: বিদুৎ চমকানোর সময় আলোর এবং শব্দের তুলনামূলক গতি
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
প্রতিধ্বনি (Echo)
কোনো উৎস থেকে সৃষ্ট শব্দ যখন দূরবর্তী কোন মাধ্যমে বাধা পেয়ে উৎসের কাছে ফিরে আসে তখন মূল ধ্বনির যে পুনরাবৃত্তি হয় তাকে শব্দের প্রতিধ্বনি বলে। এককথায়, প্রতিফলিত শব্দকে বলা হয় প্রতিধ্বনি। কোন শব্দ শোনার পর প্রায় ০.১ সেকেন্ড পর্যন্ত এর রেশ আমাদের মস্তিষ্কে থাকে। এই সময়কে শব্দানুভূতির স্থায়িত্বকাল বলে। শব্দের প্রতিধ্বনি শোনার জন্য উৎস ও প্রতিফলকের মধ্যবর্তী দূরত্ব ন্যূনতম ১৬.৬ মিটার হওয়া প্রয়োজন। শব্দের প্রতিধ্বনি ব্যবহার করে সমুদ্র ও কুয়ার গভীরতা নির্ণয় করা যায়।

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
শ্রাব্যতার পাল্লা এবং শব্দোত্তর ও শব্দেতর তরঙ্গ
Audibility range and Ultrasonic & Infrasonic waves
উৎসের কম্পাঙ্ক ২০ Hz থেকে ২০,০০০ Hz এর মধ্যে সীমিত থাকলেই কেবল মানুষ তা শুনতে পায়। এক শ্রাব্যতার পাল্লা বলে। যে তরঙ্গের কম্পাঙ্ক ২০,০০০ Hz এর চেয়ে বেশি, তাকে শব্দোত্তর (আল্ট্রাসনিক) তরঙ্গ বলে। আর কম্পাঙ্ক ২০ Hz এর চেয়ে কম তাকে শব্দেতর (ইনফ্রাসনিক) তরঙ্গ বলে। কোনো কোনো জীবজন্তু আল্ট্রাসনিক শব্দ শুনতে পায়। যেমন: কুকুরের শ্রাব্যতার ঊর্ধ্বসীমা প্রায় ৩৫,০০০ Hz এবং বাদুড়ের প্রায় ১,০০,০০০ Hz। বাদুড় চোখে দেখতে পারেনা। বাদুড় চলার সময় বিভিন্ন কম্পাঙ্কের শব্দোত্তর তরঙ্গ সৃষ্টি করে। বাদুড় তার সৃষ্ট শব্দোত্তর তরঙ্গের প্রতিধ্বনি শুনে প্রতিবন্ধকের অবস্থান এবং প্রকৃতি সম্বন্ধে ধারণা লাভ করে এবং পথ চলার সময় সেই প্রতিবন্ধকপরিহার করে। কোয়ার্টজ ক্রিস্টাল অসিলেটরের মাধ্যমে শব্দোত্তর তরঙ্গ উৎপন্ন করা যায়।
শব্দোত্তর তরঙ্গের ব্যবহার
১. রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে শব্দোত্তর তরঙ্গ। আলট্রাসনোগ্রাফি হলো ছোট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের শব্দ ব্যবহার করে ইমেজিং।
২. সমুদ্রের গভীরতা নির্ণয়, হিমশৈল, ডুবোজাহাজ ইত্যাদির অবস্থান নির্ণয়।
৩. সূক্ষ্ম ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করার কাজে।

ডপলার ক্রিয়া বা প্রভাব (Doppler Effect)
শব্দের উৎস ও শ্রোতার মধ্যে আপেক্ষিক গতি বিদ্যমান থাকলে শ্রোতার নিকট উৎস হতে নিঃসৃত শব্দের তীক্ষ্ণতা বা কম্পাঙ্কের যে আপাত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়, তাকে ডপলার ক্রিয়া বা প্রভাব বলে। ডপলার ক্রিয়ার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত তিনটি বিষয় বিবেচনা করা হয়-
ক) উৎস গতিশীল কিন্তু শ্রোতা স্থির
- উৎস শ্রোতার দিকে অগ্রসর হলে শব্দের কম্পাঙ্ক প্রকৃত কম্পাঙ্কের চেয়ে বেশি হবে।
- উৎস শ্রোতার থেকে দূরে সরে গেলে শব্দের আপাত কম্পাঙ্ক প্রকৃত কম্পাঙ্কের চেয়ে কম হবে।
খ) উৎস স্থির কিন্তু শ্রোতা গতিশীল
- শ্রোতা উৎসের দিকে অগ্রসর হলে শব্দের আপাত কম্পাঙ্ক প্রকৃত কম্পাঙ্কের চেয়ে বেশি হবে।
- শ্রোতা উৎসের থেকে দূরে সরে গেলে শব্দের আপাত কম্পাঙ্ক প্রকৃত কম্পাঙ্কের চেয়ে কম হবে।
গ) উৎস ও শ্রোতা উভয়ই গতিশীল
উৎস ও শ্রোতার মধ্যে আপেক্ষিক গতিবেগ না থাকলে কম্পাঙ্কের কোন পরিবর্তন হয়না। রেলওয়ে স্টেশনে আগমনরত ইঞ্জিনে বাঁশি বাজাতে থাকলে প্লাটফর্মে দাঁড়ানো ব্যক্তির কাছে বাঁশির কম্পনাঙ্ক আসলের চেয়ে বেশি হবে।

Read more